বুধবার, ২৮ জুলাই ২০২১, ১১:৩৬ অপরাহ্ন
শিরোনাম :

মুদি দোকানের কর্মচারী থেকে কোটি টাকার মালিক!

নিজস্ব প্রতিবেদক / ৭৭৩ শেয়ার
প্রকাশিত : শনিবার, ২৩ জানুয়ারী, ২০২১

ইতিহাস ঐতিহ্যে সমৃদ্ধ এক জেলার নাম নরসিংদী। চারিদিকে নদীবেষ্টিত প্রাকৃতিক সৌন্দর্য মন্ডিত একটি ইউনিয়ন চরদিঘলদী। নরসিংদী সদর উপজেলার মাধবদী থানার মেঘনা নদীর ওপারে অবস্থিত এই প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের লীলাভূমী। জীবনযাত্রার মান তেমন উন্নত না হলেও সবুজ সুন্দর ফসলি মাঠ ,কৃষকের গোলা ভরা ধান গোয়াল ভরা গরু , সাথে আছে নদীতে রূপালী ইলিশ, রুই কাতলা আর ছোট ছোট মাছে ভরপুর মেঘনা নদী।

নরসিংদীর চরদিঘলদীর অন্দরমহলের খবর নিয়ে ধারাবাহিক প্রতিবেদনের আজ থাকছে প্রথম পর্ব।

নদীতে জাল ফেললেই মানুষের জীবিকার আর কোন অভাব থাকে না। নদীবেষ্টিত দুর্গম চরাঅঞ্চল হলেও জীবনযাত্রায় উন্নত সমৃদ্ধ ছিল এই সবুজ পল্লী। হঠাৎ করেই চরদিঘলদী ইউনিয়নে নেমে আসে ১ কালো অধ্যায়। ১৯৯৮ইং সালে প্রথমবারের মতো ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে চেয়ারম্যান পদপ্রার্থী হন আবু মুনসুর সরকার নামে এক ব্যক্তি। যিনি ছিলেন একজন সাধারণ মুদি দোকানের কর্মচারী ,কোনরকমে করতে পারতেন স্বাক্ষর। উনার প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী ছিলেন আব্দুল হেকিম ফকির যিনি ছিলেন বিএ পাস একজন ব্যক্তিত্ববান পুরুষ ,আরো একজন যিনি প্রার্থী ছিলেন আব্দুল বাতেন সরকার উনিও নারায়ণগঞ্জের প্রতিষ্ঠিত ব্যবসায়ী এবং একজন শিক্ষিত মানুষ।

জানা যায়,দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য ওই নির্বাচনে টেটা যুদ্ধ লাগিয়ে দিলেন আবু মনসুর সরকার। টেটা যুদ্ধে ঝরে গেল সাহাজ উদ্দিন নামে এক ব্যক্তির প্রাণ । মানুষ হত্যা করে উনি দখল করে নিলেন ৫নং ওয়ার্ডের কেন্দ্রটি ,সেখানে উনি বিপুল ভোটে জয়লাভ করলেও অন্য সকল কেন্দ্রে পরাজিত হলেন। চেয়ারম্যান নির্বাচিত হলেন আব্দুল বাতেন সরকার ।সেই নির্বাচনের দিন সন্ধ্যাবেলায় গ্রামের বিভিন্ন স্থানে টেটা দিয়ে হামলা করল মুনসুর বাহিনী। রক্তাক্ত হলো চরদিঘলদী ইউনিয়নের মাটি।

পরবর্তীতে দুই বছর যেতে না যেতেই টেটা যুদ্ধ লাগিয়ে সকল মেম্বারদের দিয়ে সহজ সরল চেয়ারম্যান আব্দুল বাতেন সরকার কে অনাস্থা দেওয়ালেন আবু মনসুর সরকার। পরে উপ- নির্বাচনে ভয়ঙ্কর টেটা যুদ্ধ লাগিয়ে জোরপূর্বক চেয়ারম্যান নির্বাচিত হলেন আবু মুনসুর সরকার। বহু মানুষ আহত হলেন রক্তাক্ত হলো চরদিঘলদী ইউনিয়নের সবুজ মাঠ।

ধূসর থেকে ধূসর হতে থাকলো চরদিঘলদী ইউনিয়নের মাটি। হারিয়ে যেতে থাকলো তার শান্তি আর সমৃদ্ধি। এক ভয়াবহ অনিশ্চয়তার দিকে এগিয়ে যেতে থাকলো চরদিঘলদী ইউনিয়নের মানুষের জীবন। শুরু হলো লুটপাট ,চাঁদাবাজি ,এক গ্রামের সাথে অন্য গ্রামের ঝগড়া লাগিয়ে মীমাংসার নামে কোটি কোটি টাকা আত্মসাৎ।এরইমধ্যে ঘটে গেলো অনেক টেটা যুদ্ধ হারিয়ে গেল অনেক মানুষ।

২০০৩ সালে আবার চরদিঘলদী ইউনিয়নে এল অভিশপ্ত সেই নির্বাচন। এবারও সেই নিরীহ মানুষের একই পরিণতি। ভয়াবহ টেটা যুদ্ধ শুরু হয়ে গেল ,লন্ডভন্ড হল চরদিঘলদী ইউনিয়ন। নির্বাচনের আগেই মানুষের বাড়িঘর লুটপাট ভাঙচুর করে একশ এর উপরে মানুষকে আহত করে ভিটে মাটি ছাড়া করল ওই চেয়ারম্যান । আবারো জোরপূর্বক চেয়ারম্যান নির্বাচিত হলেন আবু মনসুর সরকার। পরের দিন সকাল বেলা এলাকার বাকি মানুষগুলোর উপর চালানো হলো ভয়ঙ্কর টেট হামলা।

আবারো আহত হলেন শত শত মানুষ। ঐদিনের ভয়াবহতা বর্ণনা করতে গিয়ে নোয়াব পুর গ্রামের মুর্শিদ মিয়া বলেন “আমাদের মনে হয়েছে যে একাত্তুরের সেই ভয়াবহ যুদ্ধ শুরু হয়ে গেছিল”। জিৎরামপুর ,টিটির চর, নোয়াবপুর ,নোয়া কান্দী, অনন্তরামপুর, চরদিঘলদী সহ বিভিন্ন গ্রামে টেটা যুদ্ধ লাগিয়ে এক বিভীষিকাময় পরিবেশ তৈরী করলেন মনসুর চেয়ারম্যান। অনন্তরামপুর ,জিৎ রামপুরে পড়তে থাকলো একের পর এক লাশ। চেয়ারম্যান সালিশের নামে হাতিয়ে নিলেন কোটি কোটি টাকা।

মুদি দোকানের কর্মচারী থেকে বনে গেলেন কোটি টাকার মালিক। এরপর আবার আসলো ২০১১সালের চরদিঘলদী ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন ,এবারও সেই ভয়াবহ টেটা যুদ্ধে নিহত হলেন চরদিঘলদী ইউনিয়ন ৭ নং ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক জমির আলী মুন্সী। ইউনিয়নের বিভিন্ন স্থানে হলো একের পর এক টেটা যুদ্ধ কিন্তু এবার আর শেষ রক্ষা হল না। রুখে দাঁড়ালেন এলাকার সাধারন জনতা।পরাজিত হলেন মনসুর চেয়ারম্যান। চেয়ারম্যান নির্বাচিত হলেন খোকন মিয়া সরকার। শান্তিপূর্ণভাবে এলাকার উন্নয়ন কর্মকাণ্ড পরিচালনা করতে গিয়ে অতীতের মতো বাধা গ্রস্থ হলেন খোকন চেয়ারম্যান ।

একের পর এক টেটা যুদ্ধ লাগিয়ে চললেন মনসুর চেয়ারম্যান। শক্তি-সামর্থ্যে দুর্বল খোকন চেয়ারম্যান নিজের পরিষদের বড় চেয়ারটি ছেড়ে দিতে হলো সাবেক চেয়ারম্যান আবু মনসুর কে। এরপর ২০১৬ সালে আবার আসলো ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন! সেই নির্বাচনে নৌকা মার্কার মনোনয়ন চাইলেন তৎকালীন চেয়ারম্যান খোকন মিয়া সরকার ও সাবেক চেয়ারম্যান আবু মনসুর সরকার। এলাকায় ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করে মানুষকে ভয় ভীতি দেখিয়ে টেটা যুদ্ধ লাগিয়ে মনোনয়ন পেতে সবাইকে বাধ্য করলেন তার পক্ষে থাকতে।

জীবনের ভয়ে মানুষ তাকে সমর্থন দিতে বাধ্য হয়। মনসুর চেয়ারম্যান বাগিয়ে নিলেন আওয়ামী লীগের নৌকা প্রতীকের মনোনয়ন। আবু মনসুর সরকারের ভয়ে আর প্রার্থী হননি তৎকালীন চেয়ারম্যান খোকন মিয়া সরকার। উনি শেখ হাসিনার প্রতি আস্থার কথা বলে নির্বাচন থেকে সরে যান। এতেও সন্তুষ্ট থাকতে পারলেন না আবু মুনসুর সরকার।

নৌকা মার্কা প্রতীক পাওয়ার পরেও নির্বাচনের আগের রাতে আবু মনসুর চেয়ারম্যানের সন্ত্রাসী বাহিনী টেটা ,বল্লম রামদা, কুড়ালসহ সকল প্রকার দেশীয় অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে হামলা করল প্রতিদ্বন্দী স্বতন্ত্র প্রার্থী আওয়ামী লীগ নেতা ইউনিয়ন তাঁতি লীগের সভাপতি আব্দুল জলিলের নিজ বাড়িতে । আহত হয় আব্দুল জলিল সহ প্রায় ৫০ জনের মতো মানুষ। ওই রাতেই এলাকা ছাড়তে বাধ্য হন স্বতন্ত্র প্রার্থী আব্দুল জলিলসহ ওনার আত্মীয়-পরিজন সকলে।

মনসুর চেয়ারম্যানের পক্ষে দৃঢ় অবস্থান গ্রহণ করেন তৎকালীন চরদিঘলদী ইউনিয়ন ছাত্রলীগের সভাপতি বর্তমান মাধবদী থানা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক,জনপ্রিয় ছাত্রনেতা দেলোয়ার হোসেন শাহীন। এবারও চেয়ারম্যান নির্বাচিত হলেন আবু মুনসুর সরকার। এবার আবু মনসুর সরকারের নজর পড়লো জনপ্রিয় ছাত্র নেতা দেলোয়ার হোসেন শাহীন এর উপর । ইউনিয়ন বিএনপি চিহ্নিত সন্ত্রাসীদের সাথে নিয়ে কৌশলে একের পর এক দুর্বল করতে থাকলেন মাধবদী থানা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক দেলোয়ার হোসেন শাহীন কে।
চলবে…


এ সম্পর্কিত আরো সংবাদ
Developed by BongshaiIT.com
ব্রেকিং নিউজ
ব্রেকিং নিউজ